• সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন

ভ্যাপসা গরমে সর্দি কাশি জ্বরের ভোগান্তি

নিউজ ডেস্ক ॥ / ৫৮ Time View
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০২২

ঢাকা মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগে গড়ে দৈনিক ৯০০ থেকে ১০০০ জন রোগী আসছে।

“ইনফ্লুয়েনজা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন কয়েকগুণ বেশি। আমাদের সপ্তাহে আটটা ইনফ্লুয়েনজা রোগী টার্গেট থাকে, যেটা এখন দিনেই ৮টার বেশি,” বলছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শাহেদুর রহমান।

প্রতিদিন যে পরিমাণ রোগী দেখছেন তাদের প্রায় ৪০ শতাংশের জ্বর, সর্দি, কাশি বলে গত কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

তার মতে, বর্তমান অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণেই এমনটা হচ্ছে। গরমের অতিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি রোগেও ভুগতে হচ্ছে।

ঋতু পরিবর্তনের এসময় সাধারণ ‘ফ্লুর সিজন’ হলেও চিকিৎসকরা বলছেন, এবার রোগীর সংখ্যা বেড়েছে- যাদের মধ্যে বেশি ভুগছেন শিশু ও বয়স্করা। নগরী জুড়েই সর্দি, কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডায়রিয়া। কারও কারও চিকেন পক্স হওয়ার তথ্যও দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

কাগজে-কলমে শরৎকাল শুরু হলেও অস্বস্তিকর ভ্যাপসা গরমে জনজীবনে যেন এখনও গ্রীষ্মের আবহ। তাপমাত্রার যত তার চেয়ে অনেক বেশি গরমের অনুভূতি হওয়ায় কষ্টকর সময় পার করতে হচ্ছে। এতে গতবারের তুলনায় এই শরতে হাসপাতালগুলোতে ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগীর চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

আবহাওয়া অফিস বলছে, অন্যবারের তুলনায় এই বর্ষায় কম বৃষ্টি হয়েছে। শরতের শুরুতেও অন্যান্য বছরের তুলনায় বৃষ্টি কম হওয়ায় গরমের তীব্রতা বাড়ছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।

চিকিৎসকরাও তাকিয়ে আছেন আবহাওয়ার দিকে। তাপপ্রবাহ কবে কমবে সেই আশায় তারা। তাদের ভাষ্য, গরম কমে গেলে জ্বর, সর্দি, কাশি কিংবা ডায়রিয়ার রোগী কমে আসবে। কিন্তু এজন্য দরকার টানা বৃষ্টি।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে ও নগরীর হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আর বয়স্কদের মাঝে ঠান্ডা-সর্দি কাশির আধিক্য বেশি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে ১৯ মাস বয়সী শিশু জান্নাতকে নিয়ে সপরিবারে রাজধানীর ডেমরা থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন তার মা তহমিনা আক্তার।

গত দুই-তিন দিন ধরে জান্নাতের ঠাণ্ডা, কাশি জানিয়ে তিনি বলেন, “কমতেছিল না। তাই আজকে নিয়া আসছি। ডাক্তার ওষুধ দিছে। বলছে, আর একটু দেরি হইলে নিউমোনিয়া হইত।”

চিকিৎসক কী পরামর্শ দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গরমে খালি গলায় ঘাম জইমা যায়। সেগুলা ঠিকভাবে মুছতে বলছে। আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে বলছে।”

প্রায় একই ধরনের সমস্যায় শ্বাশুড়িকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগে এসেছেন রুনা বেগম। গত কয়েকদিন ধরে তার শ্বাশুড়ির জ্বরের পাশাপাশি সর্দি-কাশি।

চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষমাণ রুনা বলেন, “ফার্মেসি থেইকা ওষুধ আইনা খাওয়াইছিলাম কিন্তু কমে নাই। তারপর তো এই সর্দি-কাশির জন্যি শ্বাসেও সমস্যা দেখা দিছে। বুড়া মানুষ তো। তাই তাড়াতাড়ি নিয়া আইছি হাসপাতালে।”

কেন এমন হচ্ছে?

ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শাহেদুর রহমান জানান, বাচ্চাদের মাঝে তারা এখন ইনফ্লুয়েনজায় আক্রান্ত রোগী বেশি পাচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ‘ফ্লু সিজন’ উল্লেখ করে তিনি জানান, এসময় গরমের কারণে পরিবেশে ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যায়।

তার মতে, “এই ফ্লু সিজনের কারণেই প্রচুর সর্দি জ্বর এবং কাশির বাচ্চা পাচ্ছি… প্রচুর ইনফ্লুয়েনজা পজেটিভ পাচ্ছি। ইনফ্লুয়েনজা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন কয়েকগুণ বেশি। আমাদের সপ্তাহে ৮টা ইনফ্লুয়েনজা রোগী টার্গেট থাকে, যেটা এখন দিনেই ৮টার বেশি।”

হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে যাদের নিউমোনিয়া ধরা পড়ছে, তাদের এডমিশন লাগছে, তবে সংখ্যাটা খুব বেশি নয় বলে জানান তিনি।

একই হাসপাতালের বহির্বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) ডা. মো. শাইখ আব্দুল্লাহ বলেন, “বড়দের মাঝে ঠাণ্ডা, কাশি, পেটের পীড়া, শ্বাসকষ্ট জনিত রোগী বেশি। এছাড়া নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াও আছে। এগুলা গরমের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত।”

তিনি বলেন, “বহির্বিভাগে এ বছর রোগীর সংখ্যা বেশি। শুধু মেডিসিন বিভাগে গড়ে দৈনিক ৯০০ থেকে ১০০০ জন রোগী আসছে। গতবছর এই সংখ্যাটা ছিল ৮০০ এর মত। এই রোগীদের মধ্যে হয়ত বড়জোর ৩০-৩৫ জনকে ভর্তি করা হয়। সাধারণত নিউমোনিয়া হয়েছে, জ্বর কমছে না, এমন রোগী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।”

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি হেপাটোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক শফি আহমেদ বলেন, “আউটডোরে গতবছরের চেয়ে এ বছর রোগী বেশি আসছে এবং আগতের বেশির ভাগই জ্বর, সর্দি, কাশি নিয়ে আসছে।

“শিশু হাসপাতালে এখন জ্বর, ডায়রিয়া, ডেঙ্গু রোগী বেশি। তাছাড়া চিকেন পক্সের রোগীও আছে। গরমের জন্য পানিবাহিত রোগ হচ্ছে।”

ভ্যাপসা গরমে সর্দি কাশি জ্বরের ভোগান্তি

সাম্প্রতিক সময়ে বাচ্চাদের ‘হ্যান্ড-ফুট মাউথ’ রোগ দেখা দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এ রোগটা কিছুটা বসন্তের মত। মানুষ ভাবে বসন্ত, কিন্তু এটা তা না। প্রথম দুই দিন জ্বর হবে, তারপর শরীরের গোটা গোটা উঠবে। এটা অনেক বেশি পাচ্ছি আমরা এ বছর।”

গরম কমবে কবে?

নগরীজুড়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে আবহাওয়া অফিস সুখবর দিতে পারছে না। শরতে বৃষ্টি তাপমাত্রা কমিয়ে প্রকৃতিকে শান্ত করবে এমন আভাস নেই আগামী কয়েকদিনেও।

আবহাওয়াবিদ আব্দুর রব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ মাসে লাগাতার বৃষ্টিপাত হবে না এবং এমন তীব্র গরম আরও বেশ কিছুদিন থাকবে।”

এ বছরের বৃষ্টিকে ‘দুর্বল বৃষ্টিপাত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকায় বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেই বৃষ্টি বেশিক্ষণ হবে না।

“সমুদ্রে বারবার লঘুচাপ সৃষ্টি হচ্ছে যার প্রভাব এসে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলে ও ঢাকায়। যদিও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টি হচ্ছে ও হবেও। আর এখন মূলত সূর্য মাথার ওপর থাকে, যেটা হিটিং করে বেশি। আর সেটা বাতাসের জলীয় বাষ্পকে যখন গরম করে ফেলে, তখন তা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।”

রোগমুক্ত থাকার উপায় কী?

জ্বর, ঠান্ডা, কাশি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য হাত জীবানুমুক্ত রাখার এবং নিয়মিত মাস্ক পরার কোনো বিকল্প দেখছেন না চিকিৎকরা।

ডা. শফি গরমের সময় বাসায় থাকার, জনাকীর্ণ জায়গা এড়িয়ে চলার এবং নিরাপদ পানি পান করার পরামর্শ দেন।

বাবা-মায়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, “শিশুরা প্রচুর ঘামে, ঘাম মুছতে হবে।”

মানুষ নিজেদের সমন্ধে আগের চেয়ে অনেকটা সচেতন থাকার কারণে কোভিড থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার পাশাপাশি অন্যান্য রোগ থেকেও নিজেদেরকে রক্ষা করছে বলে জানালেন ডা. শাহেদুর।

মাস্ক পরার অভ্যাস বজায় রাখার অনুরোধ করে তিনি বলেন, “গরমে তরল খেতে হবে। বাচ্চারা ন্যূনতম ৬ গ্লাস পানি খাবে। আর ভ্যাকসিনটা দিলে ভালো।”

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. মো. আলাউদ্দিন বলেন, “গরম থেকে বাঁচার উপায় হল, তাপটা যেন বেশি ক্ষতি না করতে পারে, তার ওপর নজর দেওয়া।”

তিনি কাপড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সচেতন হতে বলেন।

“যে কাপড় আমাকে আরাম হিসেবে, বাড়তি ঘাম দিবে না, সেটা পরতে হবে। সুতি কাপড় পরলে ভালো হয়। রঙও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে কালো রঙের কাপড় পরতে পারব না, কারণ কালো রং তাপকে শোষণ করে নেয়,” যোগ করেন তিনি।

যারা বাইরে কায়িক পরিশ্রম করে, তাদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি কাজের মাঝে বিশ্রাম নেওয়ার কথা এবং স্যালাইন মেশানো পানি খেতে পরামর্শ দেন।

খাবারের ব্যাপারে সচেতন হওয়ার অনুরোধ করে ডা. আলাউদ্দিন বলেন, “এই সময় ডায়রিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগবালাই বেশি হয়। দেখা যাচ্ছে, যিনি রিকশা চালাচ্ছেন, তিনি ৫ টাকা দিয়া একটা লেবুর শরবত খাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাবে যে দোকানদার লেবুর শরবতে যে পানিটা সে দিচ্ছে, সে পানিটা ভালো না।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget